Saturday, 5 March 2022

মোটরবিমা থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা আসতে পারে

 



সরকার ২০১৮ সালে যেভাবে মোটর আইন প্রণয়ন করেছে, তাতে মোটর বিমা ব্যবসায়ের ওপর কুঠারাঘাত করা হয়েছে। বিমাকারীরা এখন মর্মে মর্মে তা উপলব্ধি করছেন। এ বিষয়ে আলোচনার শেষ নেই, কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ নেই।

বিমাকারীরা প্রায়ই বলেন, ‘মোটর তৃতীয় পক্ষের দায়’ বা থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসা খুব ভালো ছিল। কারণ, কোনো দাবি উত্থাপিত হতো না। বিমাকারীদের বিশ্বাস হচ্ছে, কোনো প্রকার দাবি না হলেই বিমা ব্যবসা ভালো হয়-কী মারাত্মক, ভয়াবহ ও ভ্রান্তিমূলক! মোটর বিমা ব্যবসায়ের মূল ভিত্তি হচ্ছে জনগণের আস্থা। বিমাকারীদের মধ্যে এ আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টাই দেখা যায় না।


উল্লেখ্য, কোনো যানবাহনের কারণে কোনো ব্যক্তি যদি আহত বা নিহত হয়, অথবা যদি কোনো সম্পদের বা অন্য গাড়ির ক্ষতি হয়, তার ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য এই তৃতীয় পক্ষের বিমা করা হতো। অর্থাৎ চালক বা যাত্রীর বাইরে যে ক্ষতি হয়, সেটার ক্ষতিপূরণের জন্য ছিল এই বিমা। কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে যানবাহনের ক্ষেত্রে এই বিমা করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সেই আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে এই বিমা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।


শুধু একজন নাগরিকের অবহেলা বা গাফিলতির কারণে যদি অন্য কোনো নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এ ধরনের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থাই হচ্ছে মোটর তৃতীয় পক্ষের দায় পলিসি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নাগরিকেরা এ ধরনের পলিসি কেনেন।


 কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক যদি রাস্তায় দুর্ঘটনাকবলিত হন বা দুর্ঘটনার কারণে কারও মৃত্যু হয়, তাহলে কোনো রাষ্ট্র তার ক্ষতিপূরণের দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। রাষ্ট্রের এই দায়দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই সরকার থেকে নিবন্ধন নিয়ে বিমাকারীরা নাগরিকদের ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়।


বাংলাদেশের সাধারণ বিমাব্যবস্থা ও বিমা ব্যবসার পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, আমরা কতটা লোভী ও অপরিণামদর্শী। ২০১৮ সালের মোটর আইন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা মত উঠে আসে যা বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র কোনো অবস্থায় নাগরিকের ব্যক্তিগত আয়-ব্যয় ও ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।


শুধু একজন নাগরিকের অবহেলা বা গাফিলতির কারণে যদি অন্য কোনো নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এ ধরনের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থাই হচ্ছে, মোটর তৃতীয় পক্ষের দায় পলিসি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নাগরিকেরা এ ধরনের পলিসি কেনেন। অথচ বাংলাদেশের বিমাকারীরা দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকেন, এ ধরনের পলিসি ভালো কারণ, এ ক্ষেত্রে বিমাকারীদের দাবি দিতে হয় না।


মোটর বিমা ব্যবসা লাভজনক করতে ও মানুষের আস্থা বাড়াতে আমার ছয়টি পরামর্শ আছে। এগুলো হচ্ছে-


১. তৃতীয় পক্ষের দায় বিমা আবার আবশ্যিকভাবে চালু করা। সেই সঙ্গে মোটরচালক ও চালকের সহকারীদের (কন্ডাক্টর) জন্য পেশাগত দুর্ঘটনা বিমা চালু করা। শুধু এ তিন পলিসি থেকেই আয় হতে পারে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার প্রিমিয়াম।


২. পলিসির প্রিমিয়াম বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের একই জাতীয় পলিসির জন্য নির্ধারিত প্রিমিয়ামের হার বিবেচনা করা যেতে পারে।


৩. তিনটি পলিসি জনপ্রিয় করতে ব্যাপকভাবে সারা দেশে প্রচার করতে হবে। বড় বড় বাসস্ট্যান্ডে বিমা প্রতিনিধিদের নিয়ে অন্তত তিন বছর ধরে প্রচারণা ও সচেতনতামূলক আলোচনা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।


৪. পলিসিগুলো ব্যাপকভাবে সমাদৃত না হওয়া পর্যন্ত দেশের ঘটে যাওয়া সব দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণের জন্য একটা কমিশন গঠন করা দরকার এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি। এক্স গ্র্যাসিয়া নীতির ভিত্তিতে এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি, কারণ এসব ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে নৈতিক মানদণ্ড বেশি জরুরি।


৫. সরকারি তহবিল থেকে যে অর্থ হাজার হাজার মোটর দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারকে দেওয়া হবে, তা আবশ্যিকভাবে বাংলাদেশ বিমা অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) ব্যানারে প্রদান করতে হবে, তার প্রচার থাকতে হবে। এতে বিমার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।


৬. মোটর বিমার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে বিভাগীয় শহরগুলোতে একটি করে মোটর বিমা দাবি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা জরুরি।


এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল মোটর দুর্ঘটনাসহ সব ধরনের দুর্ঘটনাসংক্রান্ত বিমা দাবি এবং দেওয়ানি বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারবে। তবে এই মোটর ট্রাইব্যুনাল অবশ্যই দেশের প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও টেক্স অফিস ট্রাইব্যুনালের মতো পৃথক বিচারিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠবে। এ ব্যাপারে সরকার ভারতসহ অন্যান্য দেশের দুর্ঘটনা সম্পর্কিত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করতে পারে।


আমি বিশ্বাস করি, অর্থ মন্ত্রণালয়, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ও বিআইএ পরিকল্পনামাফিক এগোলে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার প্রিমিয়াম বিমা ব্যবসায় যোগ হবে। তবে সে জন্য মোটর কম্প্রিহেনসিভ পলিসি, মোটর থার্ড পার্টি পলিসি, মোটর ড্রাইভার্স রিস্কস পলিসি, মোটর ভেহিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট পলিসি-এগুলো জনপ্রিয় করতে হবে, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। তবে ব্যাপারে আরও ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা শুরু করা জরুরি।



 

No comments:

Post a Comment

বিমার তাজা খবর

গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা হবে বিমা খাতের চালিকা শক্তি

 আলা আহমেদ

Popular Posts