Saturday, 5 March 2022

বেসরকারি খাত ছাড়া বিমায় ভালো কিছু সম্ভব নয়

 ফখরুল ইসলাম

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান এম মোশাররফ হোসেন গত রোববার প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিমা খাতের নানা দিক তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফখরুল ইসলাম

প্রথম আলো: স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও বিমা খাতের এমন দুরবস্থা কেন?

শেখ কবির হোসেন: আর্থিক খাতের মধ্যে বিমা একটা গুরুত্বপূর্ণ খাত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি জড়িত ছিলেন এ খাতের সঙ্গে। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ খাতকে আলাদা নজরে দেখে থাকেন। যা–ই হোক, এটা সত্য যে বিমা খাতে দুরবস্থা আছে। তবে আগে আরও বেশি ছিল। ধীরে ধীরে হলেও দুরবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটছে।

প্রথম আলো: কোথায় উন্নতি হচ্ছে, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তো বিমা খাতের অবদান তো কমছে।

শেখ কবির: ব্যাপারটাকে এমনভাবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে জিডিপির আকার যেভাবে বড় হচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় হতে পারছে না বিমা খাত। তবে দিন আসছে। একদিন বিমা খাতই হবে আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ। যদিও তার আগে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক কাজ করার আছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাচ্ছি। উন্নয়নশীল দেশের জন্য উন্নয়নশীল মানের বিমা খাত তৈরির জন্যও আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।

প্রথম আলো: এই ‘আমাদের’ বলতে কাদের বুঝিয়েছেন?

শেখ কবির: খাত–সংশ্লিষ্ট সবাইকে। প্রধানত অর্থ মন্ত্রণালয়, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সদস্যদের বুঝিয়েছি। সবাইকেই যার যার জায়গা থেকে ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে একটা কথা হলফ করে বলতে পারি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা দুর্বল থাকলে একটি খাত বেশিদূর এগোতে পারে না।

প্রথম আলো: আইডিআরএ কি দুর্বল নিয়ন্ত্রক সংস্থা?

শেখ কবির: দুর্বলই তো। চেয়ারম্যান ও চার সদস্য নিয়ে আইডিআরএর কাঠামো। প্রায় পাঁচ বছর হতে যাচ্ছে আইডিআরএর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্য পদে (লাইফ ও নন–লাইফ) নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। সংস্থাটিতে এখন অফিসার ও জুনিয়র অফিসারসহ ৫০ জনের মতো লোক চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন। তাঁরা এরই মধ্যে দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাঁদের চাকরি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি বিশেষ আদেশ দিয়ে পাকা করতে পারে। বিশেষ আদেশে ফাঁসির আসামিদের পর্যন্ত ক্ষমা করে দেন রাষ্ট্রপতি। এই সংস্থায় যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁরা তো আর আসামি নন। কয়েকজন আছেন আবার বিভিন্ন ক্যাডার থেকে প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া। তাঁরা জ্ঞানী ও পারদর্শী, এতে সন্দেহ নেই। তবে প্রেষণে আসা লোকেদের অত দরদ থাকে না, যতটা থাকে সংস্থার নিজস্ব লোকদের। বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে আইডিআরএকে শক্তিশালী করা ও বিমা একাডেমি গঠনই হচ্ছে এখন প্রধান কাজ।

প্রথম আলো: সমাধান কারা করবে? আপনাদেরও তো দায়িত্ব আছে।

শেখ কবির: অর্থ মন্ত্রণালয় করবে। এরপর করবে আইডিআরএ। আমাদের দায়িত্ব আমরা পালন করছি। তবে আমাদেরও দোষ আছে। কেউ কেউ সময়মতো বিমা দাবি পরিশোধ করতে চান না। এর বদনাম গিয়ে পড়ে গোটা বিমা খাতের ওপর। আইডিআরএর অস্থায়ী লোকদের স্থায়ী করার ব্যাপারে গতবার বিমা দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় কথা বলেছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যদি কাজ না হয়, কী আর বলব? বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডেও নিয়োগ নিয়ে একই ধরনের সমস্যা ছিল। বিশেষ যোগ্যতা অর্থাৎ অভিজ্ঞতাকে আমলে নিয়ে প্রয়োজনে শর্ত শিথিল করে হলেও তাঁদের নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।

প্রথম আলো: বিমা খাতের উন্নয়নে একটি পদক্ষেপের কথা বললে আপনি কি বলবেন?

শেখ কবির: সবকিছু বিমার আওতায় আনতে হবে এবং এগুলো যথাযথ নজরদারির মধ্যেও রাখতে হবে। সরকারি সম্পত্তির বিমা করার বাধ্যবাধকতা আছে। অনেকেই তা করেন না। এটা দেখার কেউ নেই। একটি ভবন নির্মাণের আগে যেমন রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন, মাটি পরীক্ষা ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নিতে হয়, তেমনি বিমাও করা থাকতে হবে। নইলে ভবন নির্মাণ করা যাবে না বলে বাধ্যবাধকতা আনতে হবে। আবার আগে তৃতীয় পক্ষের বিমা ছিল বলে বিমা পলিসি ছাড়া রাস্তায় গাড়ি বের হতে পারত না। এখন কোনো পলিসিই লাগছে না। পলিসি ছাড়াই গাড়ি বের করা হচ্ছে, যা বিশ্বের কোথাও নেই। একসময় বাসে লেখা থাকত ‘যাত্রীদের জীবন বিমাকৃত’, এখন থাকে না। কারণ, এই বাধ্যবাধকতা অনেক আগেই তুলে নেওয়া হয়েছে। চাপিয়ে দিয়ে কোনো কাজ ভালো হয় না, আবার চাপিয়েও দিতে হয়। যেমন অনেক মানুষ কর দিতে চান না। কিন্তু চাপানো আছে বলেই কর দিতে বাধ্য হন তাঁরা।

প্রথম আলো: বিমা খাতে প্রায়ই অনিয়ম–দুর্নীতির কথা শোনা যায়। পুরো খাতকে স্বয়ংক্রিয়ব্যবস্থার আওতায় আনলে কি সেগুলো একটু কমত?

শেখ কবির: অবশ্যই কমত। স্বয়ংক্রিয়ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ হচ্ছে। দুঃখজনক যে তা হচ্ছে শুধু আ
ইডিআরএ, সাধারণ বীমা করপোরেশন, জীবন বীমা করপোরেশন এবং বিমা একাডেমিতে। বেসরকারি খাত যেখানে বিমা খাতের প্রধান, সেখানে এ খাতই থাকছে স্বয়ংক্রিয়ব্যবস্থার বাইরে।

প্রথম আলো: বিমা খাতের ভবিষ্যৎ কী?

শেখ কবির: এ খাতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, খুবই উজ্জ্বল। অর্থনীতিতে অবদানের দিক থেকে আর্থিক খাতের মধ্যে বিমা খাত একসময় ব্যাংক আর পুঁজিবাজারকেও ছাপিয়ে যাবে। তবে তার আগে আইডিআরএকে শক্তিশালী করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

No comments:

Post a Comment

বিমার তাজা খবর

গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা হবে বিমা খাতের চালিকা শক্তি

 আলা আহমেদ

Popular Posts